নোয়াখালী-হাতিয়ার ঐতিহ্য আপ্যায়নে পিঠাপুলি-সংস্কৃতি


admin প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩১, ২০২৩, ১২:১৭ অপরাহ্ন /
নোয়াখালী-হাতিয়ার ঐতিহ্য আপ্যায়নে পিঠাপুলি-সংস্কৃতি
প্রিন্ট করুন

লামার আলো ডেস্ক:-
হরেক রকম পিঠা বানিয়ে মেহমান আপ্যায়ন করা নোয়াখালী জেলার ঐতিহ্য। কবি বেগম সুফিয়া কামাল-এর লেখায় ‘পৌষপার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশিতে বিষম খেয়ে/ আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে’ এই ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার সর্বত্রয় ফুটে উঠে। একেবারে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে পিঠা নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার নজির এখনো মিলে। শহর কিংবা তথাকতিথ আধুনিক সমাজে এ প্রচলনটি এখন দেখা যায়না। এখনো মনে পড়ে ছোট বেলায় আমাদের আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সময় গরুর গাড়িতে চড়ে যেতাম। একটি গরুর গাড়িতে শুধু নানান আইটেমের পিঠা সামগ্রীর পাত্র বোঝাই করা থাকতো। এসবের মধ্যে মূল উপাদান ডাল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন আলপনা খসিত ফাকন পিঠা, নারিকেল দিয়ে তৈরি পুলি পিঠা, চিনি মাখানো গজা, মিঠাইয়ের জিলাপি, চালভাজা গুড়ি করে ঝাল মিঠাই মিশিয়ে বনানো ঝাললাও, খেজুরের রসে ভেজানো সাঁজের পিঠা, ডিম-চিনি মিশানো আনতাশা পিঠা, একই উপাদানে তৈরি করা ‘বরা’ পিঠা, ‘ভাপা’ পিঠা, ‘সাইন্না’ পিঠা, কলাপাতা পেছিয়ে পচা পিঠা আরো কত কি হাতের তৈরি পিঠা।
মেহমান আপ্যায়নে উপরোক্ত পিঠা ব্যতিত তাৎক্ষণিক ‘পাটি সাপটা’ পিঠা, সকালের খেজুরের গুড় দিয়ে মাখিয়ে খেতে দেয়া হতো ডিম মিশানো চিতই ‘আঞ্চলিক ভাষায় চিতল’ পিঠা। এর সাথে ‘সাঁজের পিঠা’ খেজুরের রসে নারিকেল মিশিয়ে তৈরি সিরা দিয়ে শীতের সকালের নাস্তায় এইসব পিঠা ছিল ঐতিহ্যেগত খাবার-নাস্তা। মাটির (তাবা) পাত্রে তৈরি চুলা থেকে সদ্য নামানো গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চিতই, পাটি সাপটা আর সাঁজের পিঠার স্বাদ ও তৃপ্তি ছিল অসাধারণ। সন্ধায় ঘরে তৈরি ভাপা পিঠা খাওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল। এসব পিঠা তৈরি বা খাওয়ার সাধ ইচ্ছা দু’টায় যেন এখন সাধ্যের টানপোড়নে অনেকটা ম্লান।
এছাড়া, শীতকালে পৌস-মাঘ মাসে খেজুরের রসের পায়েস-মোটা চালের সিন্নি, পিঠাপুলি খাওয়ার একটা প্রতিযোগিতা ছিল ইভেন এখনো। আর শীতের পিঠাপুলি, বাঙালির শেকড়ের আদি ঐতিহ্য। শহরে থাকা লোকেরা শীতের পিঠা খাওয়ার জন্য গ্রামে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল। গ্রামবাংলার সেই রসাল পিঠা-পায়েস আর পরিবারের সবাই মিলে ছোট বড় সকলে এক সাথে হৈ-হল্ল করে পিঠা খাওয়ার উৎসবরীতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বাড়ির আঙিনায় মাটির চুলার ওপর মাটির হাঁড়িতে পিঠা বানানোর যে দৃশ্য, তা এখন আর সহজে চোখে পড়ে না। কাকা, মামা, বড় ভাইদের গ্রামে আগমনে সে সময় অনেক আনন্দ পেতাম। এখনকার প্রজম্ম সে সব আনন্দ থেকে বঞ্চিত।সাধ এবং সাধ্যের সমন্বয় করে অনেক পরিবারে এখনো সে সব পিঠা তৈরির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের ছোট বেলার উৎসব মূখর একটা গ্রামীণ পরিবেশ এ ক্ষেত্রে চোখে পড়েনা। আমার শশুর বাড়িতে এখনো আমার মাতৃতুল্য শাশুড়ী নানান প্রকার নোয়াখালীর (হাতিয়া) ঐতিহ্যমাখা কিছু পিঠা পুলি তৈরি করে। সে সব পিঠা দেখলে আমার শিশুকালের কথা, ছায়াবিথি গ্রামের মেটোপথে গরুর গাড়িতে চড়ে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, উৎসব মূখর পরিবেশে ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির ধুম পড়া ইত্যাদি; স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠে।
কলাপাতা মোড়ানো ভাপ দিয়ে তৈরি পিঠাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় পচা পিঠা বলা হয়। সাইন্না পিঠার পক্রিয়ায় এটি তৈরি হতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেভাবে ভিনি চাল দিয়ে কলাপাতা পেচিয়ে বানানো হয়; ঠিক একই রকম। মজার ব্যাপার হচ্ছে পিঠার বিষয়ে আমাদের নোয়াখালীর হাতিয়াবাসীদের ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ। এর কারণ; মূলত আদি ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত হয়েছে এখানকার (চট্টগ্রামের) পিঠা সংস্কৃতি। আসলে সব পিঠাই সারা বাংলায় তৈরি হয়। অঞ্চল ভেদে নামের উচ্চারণ ভিন্ন হয় এবং গঠনে ও সাধে সামান্য তফাত থাকে।
শীত এলেই যেন হরেক রকম সুস্বাদু পিঠার বাহারি আয়োজন। কুয়াশার চাদরেঢাকা শীতের হিমেল হাওয়ায় ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠার স্বাদ না নিলে বাঙালির যেন তৃপ্তি মেটে না। নিজেদের আদি ঐতিহ্য ধরে রাখতে দেশের সর্বত্রই গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে চলছে পিঠা তৈরি ও খাওয়ার ধুম। এ ছাড়া ক্রেতাদের চাহিদার কারণে বিভিন্ন পাবলিক প্লেজে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ভাপা পিঠার পাশাপাশি চিতই পিঠা, পোয়া পিঠাসহ নানা রকমের দোকান নিয়ে বসেন। শীতের সকাল কিংবা সন্ধ্যায় হাওয়ায় ভাসছে এসব পিঠার ঘ্রাণ। শীতে বাঙালির খাবারের ঐতিহ্যে মিশে আছে নানান প্রকার পিঠাপুলির সাধ। ঐতিহ্যমাখা এসব পিঠাপুলির উৎসব প্রতিটি ঘরে অনুরনিত হবে; ঘ্রান ছড়িয়ে পড়বে এ বাড়ি থেকে সে বাড়িতে এমন প্রত্যাশা প্রজম্মের।

মোঃ কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক, লামা প্রেসক্লাব। ১২ মাঘ ১৪২৯ বাংলা।