
নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী: নরসিংদীর রায়পুরায় একই নাম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ নম্বর (ইআইআইএন) ব্যবহার করে কয়েক বছর ধরে চলছে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ ঘটনায় প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ও স্থানীয়রা।
একই নাম ও একই ইআইআইএন নম্বর থাকায় বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম, শিক্ষা বোর্ডের তথ্য, শিক্ষার্থীদের পরিচয় এবং নথিপত্র নিয়ে প্রায়ই জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব জটিলতা থেকে মুক্তি চাচ্ছে স্থানীয়রা। এ এ ঘটনার তথ্য পেয়ে নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছেন।
জানা যায়,নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের গৌরিপুর গ্রামে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত হওয়ার পর ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি পাঁচজন শিক্ষকসহ এমপিওভুক্ত হয়।
২০০৫ সালের পর বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে দুই শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান ও আহসান হাবিবকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর আদালতের মাধ্যমে দুই ভাই স্বপদে পূর্নবহাল হন। পরে তারা ২০০৬ সালে মহেশপুর ইউনিয়নের ঘাগটিয়া এলাকায় একই নাম ও একই ইআইআইএন নম্বর ব্যবহার করে কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল ঘাগটিয়া নামে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুরু করে। তখন থেকেই একই পরিচয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলতে থাকে। দুই ভাইয়ের বিরোদ্ধে এসব ব্যাপারে এর আগেও স্থানীয়রা বিভিন্ন মানববন্ধন ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়- গৌরিপুর কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলের একটি চারতলা ভবনসহ শিক্ষার্থী রয়েছে কয়েক শতাধিক। অন্যদিকে কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল ঘাগটিয়া নামক প্রতিষ্ঠানটি দুচলা তিনটি টিনের ঘরে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়নি কাউকে। রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে গত ১৪ জুলাই ক্লাস চলাকালীন সময়ে শ্রেণি কক্ষে শুধু মাত্র দুইজনকে বসে থাকতে দেখা যায়। জানতে চাইলে তারা ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়। এর মধ্যে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান জানায়, সপ্তম শ্রেণিতে মোট ১০৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
তার মতে- সবাই উপস্থিত হলে ছোট এই রুমে একসাথে শ্রেনি কার্যক্রম করা যায়না। কক্ষটি শিক্ষার্থী ধারণ ক্ষমতা থেকে তুলনামুলক ছোট এজন্য তাদের অনেক কষ্ট হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুটি প্রতিষ্ঠানেই আটজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের তথ্য রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে সাতজনই কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল ঘাগটিয়াতে কর্মরত। তারা বসে বসে কোনো প্রকার পাঠদান ছাড়াই বেতন ভাতা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে গৌরিপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলে রয়েছেন মাত্র একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক। তিনি প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় যাবত কোনো প্রকার বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। শিক্ষার্থীরাও বঞ্চিত হচ্ছেন উপবৃত্তি থেকে। শতাধিক শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য স্কুলটিতে নন এমপিওভুক্ত খন্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদের বেতন আসছে স্থানীয় বিত্তশালীদের কাছ থেকে।
কোহিনূর জোট মিলস হাই স্কুল ঘাগটিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান জানান, ২০০৬ সালের শেষার্ধে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবু মোহাম্মদের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা হয় ঘাগটিয়া এলাকায়। ২০০৭ সাল থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পরে আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দাবি- আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুসারেই পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়।
এ ব্যাপারে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, এটি একটি গুরুতর অনিয়ম। দুই ভাই মিলে যেটি চালাচ্ছে এটির কোনো বৈধতা নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে অবিলম্বে ফিরে যেতে হবে মূল অবস্থানে। আদালতের রায় থাকলে ও এখানে কোন স্কুলের কার্যক্রম চলে না বলেও জানান তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সামালগীর আলম জানান, গৌরিপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলই মূল প্রতিষ্ঠান। তবে ঘাগটিয়া কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল পরিচালিত হচ্ছে আদালতের আদেশের ভিত্তিতে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানার বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। পরে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।
আপনার মতামত লিখুন :