লামা উপজেলায় নির্যাতন, ‌চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাশুল: অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা—পিসিসিপি নেতার পরিবারের সর্বনাশ


admin প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২২, ২০২১, ৪:০৪ অপরাহ্ন / ৩৭
লামা উপজেলায় নির্যাতন, ‌চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাশুল: অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা—পিসিসিপি নেতার পরিবারের সর্বনাশ
প্রিন্ট করুন

 নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান।

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং জাতিগত উত্তেজনার ভয়াবহ চিত্র আবারও সামনে এসেছে এক বাঙালি পরিবারের করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী স্থানীয় বাঙালিদের ভূমি অধিকার, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজির ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ‌বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া পিসিসিপি নেতা গিয়াস মাহমুদ (২৮) এবং তার পুরো পরিবারের ওপর গত দেড় দশক ধরে চলা অবর্ণনীয় নির্যাতন এখন এক চরম মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।
বংশানুক্রমিক টার্গেট ও ২০০৭ সালের হত্যাকাণ্ড:
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৭ সালের মার্চ মাসে। গিয়াস মাহমুদের বাবা আবুল কালাম সমির সন্ত্রাসীদের দাবিকৃত চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে অপহরণ করা হয়। পরবর্তীকালে দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করে স্থানীয় মৌজা হেডম্যান বরেন ত্রিপুরার সুপারিশে তাকে মুক্ত করা হলেও, অপহরণকালীন পৈশাচিক নির্যাতনের কারণে তিনি মাত্র ১ মাস ১২ দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন। বাবার সেই হত্যার বিচার না পাওয়া এবং পাহাড়ী বাঙালিদের অস্তিত্ব রক্ষায় গিয়াস মাহমুদ ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি)-এর লামা উপজেলা সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২১ সালের রাজনৈতিক আক্রোশ ও অপহরণ:
বাঙালিদের ওপর বৈষম্য এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গিয়াস মাহমুদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদানসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। এই প্রতিবাদের জেরে তাকে ৩০ আগস্ট ২০২১ তারিখে অপহরণ করা হয়। সন্ত্রাসীরা তাকে টানা তিনদিন অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে হত্যার উদ্দেশ্যে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। পরবর্তীতে স্থানীয় এক প্রভাবশালী কারবারীর জিম্মায় মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
প্রতিশোধের বিষাক্ত ছোবল: মায়ের সামনে বোনকে গণধর্ষণ ও আত্মহত্যা গিয়াস মাহমুদ মুক্তি পেলেও সন্ত্রাসীদের তান্ডব থামেনি। তাকে পুনরায় ধরার জন্য তার বাড়িতে অন্তত দুইবার সশস্ত্র হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। গিয়াস মাহমুদকে না পেয়ে সন্ত্রাসীরা তার পরিবারের ওপর প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়। পৈশাচিকতার চরম সীমা লঙ্ঘন করে সন্ত্রাসীরা গিয়াস মাহমুদের মায়ের চোখের সামনেই তার ছোট বোন‌সাবিনা ইয়াছমিন (২৩) চারজন মিলে পৈশাচিক গণধর্ষণ করে এবং তাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। গুরুতর আহত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি ১১ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করেন। কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও সামাজিক লোকলজ্জা ও লাঞ্ছিত হওয়ার সেই বীভৎস স্মৃতি সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বিষ পান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন সাবিনা ইয়াসমিন।
রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: পরিবারটি প্রতিটি হামলার পর স্থানীয় থানা, প্রশাসন এবং আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর সুরক্ষা বা বিচার পাওয়া যায়নি। উল্টো অভিযোগ রয়েছে যে, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা সন্ত্রাসীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণে গিয়াস মাহমুদ বর্তমানে জীবন বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাযাবর জীবনযাপন করছেন। তার মা নিরাপত্তার স্বার্থে এখনও ছেলের অবস্থান গোপন রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপসংহার:রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও প্রশাসনের অসহায়ত্ব:
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব) কামরুজ্জামান জানান, “এই এলাকায় বসবাসকারী বাঙালি পরিবারগুলো নিয়মিত ভয়ভীতি এবং অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়। চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে বা প্রতিবাদ করলে অপহরণ ও খুনের মতো ঘটনা ঘটে।”
এদিকে বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার পার্বত্য চট্টগ্রামের অপহরণ, গণহত্যা ও ধর্ষণের কথা স্বীকার করে জানান, “দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এসব ঘটনায় অভিযুক্ত পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা বা গ্রেফতার করা অনেক সময় সম্ভব হয় না।” প্রশাসনের এই অসহায়ত্ব ও বিচারহীনতার কারণে গিয়াস মাহমুদ বর্তমানে জীবন বাঁচাতে যাযাবর জীবনযাপন করছেন। তার মা নিরাপত্তার স্বার্থে এখনও ছেলের অবস্থান গোপন রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।উপসংহার:লামার এই ঘটনাটি পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা এবং মানবাধিকার সংকটের এক বীভৎস প্রতিচ্ছবি। কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং পাহাড়ি বাঙালিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এমন পৈশাচিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।