পাহাড়ে হামের প্রাদুর্ভাব; প্রতিনিয়ত বাড়ছে মৃতের সংখ্যা


ontoralelama@gmail.com প্রকাশের সময় : জুলাই ২৮, ২০২৬, ৪:৫০ অপরাহ্ন /
পাহাড়ে হামের প্রাদুর্ভাব; প্রতিনিয়ত বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
প্রিন্ট করুন

বান্দরবান প্রতিনিধি:- তিন সন্তানকে নিয়ে শিশু কেবিনে বসে আছেন বাবা মেনরুত ম্রো। দুর্গম রেমাক্রী প্রাংসা এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। সে প্রাদুর্ভাবে চার সন্তানের মধ্যে এক সন্তান মারা গেছেন হামের আক্রান্ত হয়ে। কোন মতেই শেষ সম্বল তিন সন্তান মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন। বাকি তিন সন্তান তারাও হামের আক্রান্ত। যে সন্তান মারা গেছে তাকে কবর দিতেও পারেনি অভাগা বাবা। হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া তিন সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসে ভর্তি করান। এখন আটদিন ধরে হাসপাতাল বেডে শুয়ে তিন সন্তানের যত্ন নিচ্ছে বাবা মেনরুত ম্রো।

স্টার নিউজের সাথে বাবা মেনরুত ম্রো কথা হয়। ছেলে হারানো কষ্টে তিনি জানিয়েছেন, গ্রামের হঠাৎ প্রতিটি ঘরে ঘরে হাম রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ২২ তারিখে আমার ছেলে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ছেলে কবর দেয়ার আগে আরো তিন সন্তান হামের আক্রান্ত হয়। ছেলেকে কবর দিতে পারেনি তিন সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে এসে ভর্তি করিয়েছেন। তারাও একটুর জন্য হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যেত ভগবানের কৃপায় তার তিন সন্তানদের মৃত্যু হাত থেকে ফিরিয়ে এসেছে। তার তিন সন্তান সুষ্ঠ আছে বলে জানান বাবা মেনরুত ম্রো।

বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম ইউনিয়ন গুলোতে এখন হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি গ্রামে কিংবা ঘরে একই পরিবারে চার থেকে পাঁচজন হাম রোগে আক্রান্ত। দুর্গমতা কারণে সেখানে মেডিকেল টিম দুরের কথা টিকা পৌছাই নাহ সেসব গ্রামগুলোতে। এতে করে একে একে নিজ সন্তাদের প্রাণ যাচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাবে।

জেলা সিভিল সার্জন তথ্য মতে, হাম উপসর্গ নিয়ে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন এবং বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালে ৩৬ জনসহ মোট ৪১ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২ জন শিশু মারা গেছেন আর গ্রামবাসীরা বলছেন এ নিয়ে ৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত দুর্গমে অবস্থিত লেতংখুমী পাড়া । মোটরসাইকেলে একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত যাওয়ার পর আরও তিন থেকে চার ঘণ্টা পাহাড়ি পথ ও ঝিরিপথ পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছাতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক বা মেডিকেল টিম পৌঁছাতে পারে না। ফলে অসুস্থ শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। দারিদ্র্যের কারণেও অনেক পরিবার সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি।

একই চিত্র রুমা সদর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের লুথংসে গ্রাম। শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গহীন এলাকায় গ্রামের অবস্থান। সেখানে হাম আক্রান্ত হয়ে তিনশিশু মারা গেছে। আর আক্রান্ত রয়েছে শতাধিক পরিবার। বেশীর ভাগই সেখানে খুমি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু সেখানে হামের টিকা দুরের কথা স্বাস্থ্যকর্মীরা পর্যন্ত ঠিকমত পৌছাইনি। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুরা হলেন- ফ্রেলেএং খুমী (৫), খ্রেপা খুমী (১১), শইফ্রা খুমী (৫), প্রেটেম এং খুমী (৬), পলিএং খুমী (৯), প্রেটেমএং খুমী (৭), পও এং খুমী (৭) এবং কুপাও ম্রো (১৩)।

স্থানীয় বাসিন্দা অংসাই খুমী জানান, শনিবার ভোরে নয় বছর বয়সী পলিএং খুমী ও ছয় বছর বয়সী নাতয়ই খুমীর মৃত্যু হয়। এ দুজনসহ গত ১৫ দিনে রুমা উপজেলায় একই ধরনের উপসর্গে মোট আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে বিলম্ব, টিকাদানে ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আর দুই মাসে হামের আক্রান্ত হয়ে অন্তত সাত শিশু মৃত্যু পর এলাকা জুড়ে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। কেউ ভয়ে জুম থাকছে আবার কোন কোন পরিবারকে গ্রাম বাইরে রাখছেন। আর্থিক অভাবে চিকিৎসা জন্য ঝুঁকছেন সেসব পরিবার গুলো।

লুথংসে গ্রামবাসী শৈলু খুমী বলেন, গ্রামে দূরে হওয়াতেই কোন টিকা পৌছাই নাহ। গ্রামে মানুষ হামের আক্রান্ত বেশী হচ্ছে। অনেকেই ঘরে টাকা পয়সা নাই বলে হাসপাতালে আসতে পারছে না। হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে তিন শিশু মারা গেছে। আমরা খুব অসহায় এখন।

এসব গ্রামে প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ রয়েছে।অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে গাছ-গাছড়া ও ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে। এক থেকে ছয় বছর বয়সী প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন শিশুকে হামের টিকা দেয়ার সময় তিনজন শিশুকে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে আনার পথে একজন শিশুর মৃত্যু হয়।

গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো জানান, গত ২১ জুলাই তাঁর ইউনিয়নের অংলাই ম্রো পাড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে কুপাও ম্রো (১৩) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর হাসপাতাল ও রুমা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অধিকাংশ হাম রোগী। কেউ মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে কেউ বেডে শুয়ে। বেশীর ভাগই শিশু ও কিশোর। তবে অক্সিজেন জন্য হাহাকার করছে অনেক শিশুরা। মুখে লালচে ডানা, ঠোটে ছোট ছোট বিচি।

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল হাসান বলেন, গত ৩ জুন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৯ জন শিশু রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহিন হোসাইন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৬ জন রোগী জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার নিজ বাড়িতে অথবা হাসপাতালে আনার পথেই মারা গেছে। দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ টিম পাঠানো হয়েছে।